বি সি আই সি বা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন

কেমিক্যাল গুরুকুলে আজকে আমরা বি সি আই সি বা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন, সংক্ষেপে বিসিআইসি যা বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ব কেমিক্যাল নিয়ে বিশদ গবেষণা ও কাজ করা কর্পোরেশন, বাংলাদেশের রাসায়নিক শিল্পে এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বি সি আই সি বা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন এর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানসমূহ হচ্ছে:

  • শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড
  • চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড
  • যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড
  • আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড
  • ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরী লিমিটেড
  • পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরী লিমিটেড
  • টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড
  • ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড।

এসবই এই প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থ সার কারখানা।

এছাড়াও এই প্রতিষ্ঠান আরো বিভিন্ন ধরনের কারখানা আছে, যে সকল কারখানায় প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য প্রস্তুত করে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো

ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড, বাংলাদেশ ইনসুলেটর এন্ড স্যানিটারি ওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড, খুলনা হার্ডবোর্ড মিলস লিমিটেড, কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড।

 

 

ছবিতে আকাশ থেকে তোলা কর্ণফুলী কাগজ কল দেখা যাচ্ছে, যা দেশের সবচেয়ে বড় কাগজ কল।

বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সিমেন্ট ফ্যাক্টরি হচ্ছে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড যা বিসিআইসি এর অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান। কর্ণফুলী পেপার মিল লিমিটেড বাংলাদেশের কাগজ অঙ্গনে চির পরিচিত একটি নাম।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস কর্পোরেশন একটি প্রশিক্ষণ ইন্ডাস্ট্রিও পরিচালনা করে, যার নাম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস। এছাড়াও এ প্রতিষ্ঠানটির একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেকশন রয়েছে।

 

 

বিসিআইসি স্কুল এন্ড কলেজ নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে, যেখানে বিসিআইসি এর কোন কারখানা বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে এই স্কুল এন্ড কলেজটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ন্যাশনাল কারিকুলামে পাঠদান করে যাচ্ছে। মূলত বিসিআইসি এর স্টাফগণের সন্তান অথবা পোষ্যগনের জন্য এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তবে এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সকলের জন্যই উন্মুক্ত।

বাংলাদেশে কেমিক্যাল নিয়ে কাজ এবং গবেষণা করার অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস কর্পোরেশন। বিসিআইসি এর প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের দিলখুশা বাণিজ্যিক এলাকার ৩০-৩১ বিসিআইসি ভবন, ঢাকা ১০০০.

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস কর্পোরেশন শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান একজন চেয়ারম্যান যিনি সরকারের গ্রেড ১ পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান ছাড়াও বেশ কয়েকজন পরিচালক থাকেন যারা সরকারের যুগ্ম সচিব সমপর্যায়ের কর্মকর্তা। পরিচালক গণের মধ্যে কারিগরি ও প্রকৌশল, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, উৎপাদন ও গবেষণ, পরিচালক (বাণিজ্যিক) ও পরিচালক (অর্থ) – মোট পাঁচ জন। চেয়ারম্যান এবং এই 5 জন পরিচালক সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ২৭ নম্বর অধ্যাদেশের ১৯৭৬ সালের ২৫ নম্বর সংশোধনী বলে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তিনটি কর্পোরেশন যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের তিনটি কর্পোরেশন হিসেবে কাজ করে আসছিল, তাদের সমন্বিত প্রতিষ্ঠান বি সি আই সি। আজকের বিসিআইসি প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সার রসায়ন ও ভেষজ শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ কাগজ ও বোর্ড কর্পোরেশন, বাংলাদেশ ট্যানারিজ কর্পোরেশন, এই তিন কর্পোরেশনের একিভূতকরণের ফল হিসেবে ০১ জুলাই ১৯৭৬ সন হতে কার্যক্রম শুরু করে।

বিসিআইসি এর প্রতিটি কারখানার জন্য আলাদা এন্টারপ্রাইজ বোর্ড অথবা কোম্পানি বোর্ড রয়েছে। প্রতিটি এন্টারপ্রাইজ বোর্ড এ শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি বোর্ডের পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত আছেন।

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত 88 টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিসিআইসি যাত্রা শুরু করেছিল। পরবর্তীতে অন্য সংস্থা হতে তিনটি কারখানা এবং বিসিএসির নতুন ছয়টি কারখানা এই বহরে যুক্ত হয়। সরকার বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে 97 টি প্রতিষ্ঠান মধ্যে 65 টি প্রতিষ্ঠান হতে পুঁজি প্রত্যাহার করা হয়। সাতটি কারখানা প্রাক্তন মালিকের নিকট এবং সাতটি কারখানা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নিকট স্থানান্তর করা হয়। পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সরকারি সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ 13 টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে এবং শেয়ারের ভিত্তিতে আরো নয়টি শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।

বিসিআইসি এর উৎপাদিতপূর্ণ সামগ্রীর মধ্যে ৮০% রাসায়নিক সার। এর মধ্যে 70 পার্সেন্ট ইউরিয়া এবং 10 শতাংশ অন্যান্য সার। এছাড়াও বিসিআইসি সিমেন্ট, কাগজ, গ্লাস সিট, বোর্ড, স্যানিটারি ওয়্যার ও ইনসুলেটর প্রভৃতি পণ্য সামগ্রী উৎপাদন করে।

বিসিআইসি দেশে মোট ইউরিয়া সারের চাহিদার যে অংশটুকু সংস্থাধীন কারখানা সমূহ উৎপাদন সম্ভব নয় তা বিদেশ থেকে আমদানি করে। তবে তাদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অন্যতম কৃষিখাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের আপামর কৃষকদের চাহিদা মোতাবেক ন্যাযামূল্যে ইউরিয়া সার সরবরাহ ও বিতরণের মাধ্যমে দেশের চাহিদা মেটানো।

বিসিআইসি তাদের সার এবং অন্যান্য সামগ্রিক উৎপাদনের মাধ্যমে এবং বাজারজাতকরণের মাধ্যমে বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যে সকল পণ্য বিসিআইসি কম পরিমাণ উৎপাদন করে সে সকল পণ্য উৎপাদন করার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। কেননা এসেছে সরকার বুঝতে পারে একটি পণ্য উৎপাদন পরিবহন কিংবা বিপণনের ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য কি হওয়া উচিত।

দেশে কেমিক্যাল খাতে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশের শিল্পায়নে যথাযথ ভূমিকা ও অবদান রাখা বিসিআইসির অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। দেশের অনেক বেসরকারি কোম্পানি রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে কাজ করে কিংবা সার উৎপাদন করে তাদের সাথে বিসিআইসি বেশ কিছু যৌথ প্রকল্প রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভারটিস বাংলাদেশ লিমিটেড, সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড, ঢাকা ম্যাচ ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড, বায়ার ক্রপ সাইন্স লিমিটেড, বাল্ক ম্যানেজমেন্ট বিডি লি. এবং মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

বাংলাদেশে রাসায়নিক সম্পর্কিত শিল্পে অবদান রাখা, নিয়ন্ত্রণ করা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিসিআইসি এর গুরুত্ব অপরিসীম।
রাষ্ট্রীয় এই কর্পোরেশনটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.bcic.gov.bd

আরও দেখুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *